কোটা পুনর্বহালে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে এবং কোটা বাতিল বহাল রাখার দাবিতে দেড় ঘণ্টা অবরোধ কর্মসূচির পর শাহবাগ মোড় ছেড়ে দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এরপর ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া ৫টায় শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড় ছেড়ে মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এসে গতকাল বুধবার কর্মসূচি শেষ করেন। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় আবারও অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেন তারা। কোটা আন্দোলনের সমন্বয়কারী ঢাবি শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা দেড় ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরোধের পর গতকাল বুধবারের মতো কর্মসূচি শেষ করছি। আজ বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কোটা পুনর্বহালের রায় দেবে। তাই আমরা আজ বেলা ১১টায় আমাদের অবস্থান কর্মসূচি শুরু করব। এ সময় আমরা সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে অবস্থান গ্রহণ করব। যদি রায় আমাদের বিরুদ্ধে যায় তাহলে আমরা নতুন করে কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হব।
এর আগে দুপুর আড়াইটায় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহালে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে এবং ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল রাখার দাবিতে লাগাতার আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে থেকে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর-টিএসসি-হাইকোর্ট-মৎস্যভবন হয়ে শাহবাগ মোড়ে এসে অবস্থা নেয়। বিকেল পৌনে ৪টায় শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের অবরোধের ফলে আশপাশের যান চলাচল বন্ধ হয়ে শাহবাগ অচল হয়ে পড়ে। পরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষ করে তারা এই অবরোধ তুলে নেন। দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকার পর তা স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
এবার শিক্ষার্থীরা ৪ দফা দাবিতে তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। দাবিগুলো হলো- ১. ২০১৮ সালে জারি করা সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখা, ২. পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠনপূর্বক দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দেয়া (সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী ব্যতীত), ৩. সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ নেয়া, ৪. দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
প্রসঙ্গত, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে গত ৫ জুন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে সরকার। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ৪ জুলাই এ বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি হবে।
অপরদিকে ২০১৮ সালে ঘোষিত সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখাসহ চার দফা দাবিতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা। এতে ঢাকা আরিচা-মহাসড়কের উভয়ই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া ৩টা থেকে পৌনে ৫টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অবরোধে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দুই পাশে কয়েক কিলোমিটার এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। পরে বিকেল পৌনে ৫টার শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নিলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এদিকে মহাসড়কে অবরোধকালে ঢাকাগামী সড়কে গাড়িসহ আটকা পড়েন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। এ সময় তার সঙ্গে থাকা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। পরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভার কেন্দ্রীয় গো প্রজননকেন্দ্রের (ডেইরি ফার্ম) মধ্য দিয়ে সংসদ সদস্য চলে যান।
হেমায়েতপুর থেকে বাইপাইলগামী একটি বাসের যাত্রী বিল্লাল হোসেন বলেন, আমি এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বাসে বসেছিলাম। কিন্তু বাস ছাড়ার কোনো নাম নেই। বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি) থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পর্যন্ত হেঁটে এসেছি। বাকি পথ হেঁটেই যেতে হবে। যত আন্দোলনই হোক না কেন, দিনশেষে ভোগান্তিটা আমাদের সাধারণ জনগণের।
আশুলিয়া থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। এতে মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। জনদুর্ভোগ এড়াতে আমরা বিকল্প সড়ক ব্যবহার করতে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ মোতায়ন করি। তবে শিক্ষার্থীরা রাস্তা থেকে সরে আসায় এখন যান চলাচল স্বাভাবিক। এর আগে বিকেল ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটকে এসে শেষ হয়। পরে প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হচ্ছে-২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে (সকল গ্রেডে) অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিতে হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী কেবল অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করতে হবে। সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এদিকে কোটা বাতিলের দাবিতে ৩য় দিনের মতো বিক্ষোভ মিছিল ও ছাত্র সমাবেশ করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। গতকাল বুধবার দুপুর আড়াইটায় তাঁতীবাজারে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করে তারা। ফলে সড়কটিতে প্রায় ৪০ মিনিট যান চলাচল বন্ধ ছিল। আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সোহান বলেন, আমরা মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ চাই। সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। অবিলম্বে কোটা পদ্ধতি স্থায়ীভাবে বাতিল ঘোষণা করতে হবে। আমরা মনে করি, কোটা ব্যবস্থা মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আরেক শিক্ষার্থী মেহেরুন্নেসা হিমু বলেন, আমরা চাই আমাদের দেশে নারী কোটাসহ যত ধরনের কোটা আছে সব বাতিল করা হোক। কারণ আমরা নরীরা এখন আর মেধার দিক থেকে পিছিয়ে নেই। চাকরির বাজারে যদি মেধার যথাযথ মূল্যয়ন না করা হয় তাহলে সেটা হবে ভবিষ্যতের জন্য অশনী সংকেত। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো। এ সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষে সাজ্জাদ হোসাইন মুন্না বলেন, ছাত্রসমাজকে দাবিয়ে রাখা যায়না। আমরা ২০১৮ সালে প্রমাণ করেছি, ২০২৪ সালেও আমরা আমাদের দাবি আদায় করতে চাই। আমরা আমাদের আগের ৪ দফা দাবি পুনরায় পেশ করছি। শিক্ষার্থীদের ৪ দফা দাবি হলো- ২০১৮ সালে ঘোষিত সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখতে হবে; ১৮’এর পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে (সকল গ্রেডে) অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিতে হবে এবং কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সেক্ষেত্রে সংবিধান অনুযায়ী কেবল অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে; সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে; দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ‘চাকরিতে কোটা, মানি না, মানবো না’, শেখ হাসিনার বাংলায়/শেখ মুজিবের বাংলায়, কোটার ঠাঁই নাই’, মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, কোটার ঠাঁই নাই’, ‘সারা বাংলায় খবর দে কোটা প্রথা কবর দে’, ‘কোটা পদ্ধতি নিপাত যাক মেধাবীরা মুক্তি পাক’সহ নানা স্লোগান দেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

আজ বেলা ১১টায় অবস্থান কর্মসূচি
শাহবাগ ছাড়লেন কোটা বিরোধীরা রায় বিপক্ষে গেলে তীব্র আন্দোলন
- আপলোড সময় : ০৩-০৭-২০২৪ ১১:৪৬:৫৩ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৩-০৭-২০২৪ ১১:৪৬:৫৩ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ